গাভী বিত্তান্ত

    5 Ratings     1 Reviews

WISHLIST


Overall Ratings (1)

Muhammad Mosharrof Hussain
09/04/2020

“উপাচার্য না গো আচার্য” শিরোনামে একটা লিফলেট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়লো এবং ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করলো। লিফলেটটা মূলত ঢাবি উপাচার্য মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের গাভী পালনের বিরুদ্ধে তীব্র রোষারক্ত ভাবের কিঞ্চিৎ প্রকাশ মাত্র; যারা তার বিরোধিপক্ষ তারাই এ অনলটি জ্বালিয়েছে। উপাচার্য আবু জুনায়েদ একটা গাভী পালন করতেই পারেন, কিন্তু এ স্বাভাবিক কাজটির বিরুদ্ধাচরণ কেন? আর কেনই বা একজন উপাচার্য দুনিয়ার এতো কিছু থাকতে গাভী পালবেন? একজন উপাচার্যর গাভীপালনের সূত্র এবং একে ঘিরে বিচিত্র ঘটনা নিয়েই মূলত আহমদ ছফার বিখ্যাত উপন্যাস “গাভী বিত্তান্ত”। আমি বুঝেছি, আহমদ ছফা এই গাভীটির মধ্য দিয়ে কিছু চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। যেমন: দিলরুবা খানমের একান্ত নিজস্ব মনোনীত প্রার্থী আবু জুনায়েদ যখন উপাচার্য’র পদ দখল করার পর দিলরুবা খানমের স্বার্থবিরোধী কাজ করতে থাকলেন তখনই দিলরুবা খানম উপাচার্যর ঘোরতর বিরোধী হয়ে উঠেন ; আবু জুনায়েদের স্ত্রী নুরুন্নাহার বানুর চাচার পক্ষ থেকে উপহার পাওয়া গাভী প্রথম-প্রথম নুরুন্নাহারের মনে ধরলেও যখন দেখলেন এ গাভীকে কেন্দ্র করে পরিবারে তার স্বার্থ খর্ব হচ্ছে এবং তার বাদশাহী আঙিনা দিনদিন সঙ্কুচিত হচ্ছে তখন তিনি গাভীর একমাত্র বিদ্বেষী হিসেবে দাঁড়িয়ে গেলেন। শঙ্কর জাতির গাভীটির ওলানে হাত দিয়ে যেমন আবু জুনায়েদসহ বিভিন্নজন মজা নিতেন তেমনি উপাচার্যর চেয়ারে বসার পর আবু জুনায়েদের সাথেও অনেকে মজা নিতে থাকেন; এখানেও দিলরুবা খানমের সাথে নুরুন্নাহারের সাদৃশ্য ধরা পড়ে। আমার একটি প্রশ্ন থেকে গেল, গাভীটি তো একা ছিল, তাহলে গর্ভবতী হলো কীভাবে? গাভীর পেটে বাচ্চাটি অকস্মাৎ আহমদ ছফা মনে হয়, উড়ে এনে জুড়ে ঢুকালেন। আহমদ ছফার বিখ্যাত শিষ্য, ড. সলিমুল্লাহ্ খানকে ছফার বিষয়ে একটা প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি উত্তরে বলেছিলেন, আমরা সবাই জানি যে আমাদের পেন্টের নিচে কী আছে, তবুও আমরা ঢেকে রাখছি; আহমদ ছফা লেখককে পেন্ট দেখিয়ে বোঝাতেন যে, পেন্টের নিচে এমন কিছু আছে যা লজ্জার খাতিরে দৃশ্যযোগ্য নয়। এখানেও আহমদ ছফা এমিন কিছু করেছেন কি-না জানি না! আপনি যদি উপন্যাসটি না পড়ে থাকেন তাহলে শুনুন: এটি এমন কোনো উপন্যাস নয় যে, না-পড়লে পাঠক হিসেবে অপূর্ণতা থেকে যাবে। কিন্তু পড়লে আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং তাকে ঘিরে চারপাশের মহলজুড়ে যে নানামাত্রার কার্যক্রম বিচিত্রবেগে সম্পন্ন হয় তা বেশ ভালো বুঝতে পারবেন। উচ্চবিত্ত পরিবারের নানা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাও অনুধাবন করা আপনার পক্ষে কঠিন হবে না। উপন্যাসটি আপনাকে আনন্দ দেবে, আপনি আপনার চাহিদা মোতাবেক প্রায় সবকিছুই পাবেন, কিন্তু গভীর কোনো জীবনবোধে আপনাকে বন্দী করবে না। এবার লেখকের মুনশিয়ানা নিয়ে কিছু বলতে হয়। উপন্যাসটির মূলোদ্দেশ্যের দিকে তাকিয়ে লেখককে কোনোক্রমেই ব্যর্থ বলা যাবে না। মূল গল্পে প্রবেশের জন্য বেশ বড়ো ধরনের প্রেক্ষাপট নিলেও তা পাঠককে তন্দ্রাচ্ছন্ন করার মতো অনুত্তেজক নয়। একজন উপাচার্যর নিয়োগদৃশ্য থেকে শুরু করে তাকে ঘিরে বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত প্রাণীকুলের স্বার্থান্বেষী কার্যক্রমের যে অপূর্ব চিত্র আহমদ ছফা তুলে ধরেছেন তা অতুলনীয় না হলেও অনবদ্য, কালোত্তীর্ণ তো বটেই। প্রাবন্ধিক আহমদ ছফার ভাষা যতটা শক্ত এবং দুর্জ্ঞেয় “গাভী বিত্তান্ত” লেখক আহমদ ছফা ততটা প্রাঞ্জল এবং সহজবোধ্য। সমাজের নিষ্ঠুর এবং অপ্রিয় দৃশ্যাবলি গল্পে, উপন্যাসে দেখতে যারা পছন্দ করেন তাদের জন্য উপন্যাসটি অবশ্যপাঠ্য। তবে, উপন্যাস কিংবা গল্পে আমরা সচরাচর যে ভাবালু ভঙ্গিমা এবং গভীর জীবনবোধের সূত্র পেয়ে থাকি এ উপন্যাসে তা অনুপস্থিত; বুদ্ধদেব বসুর ভাষিক অনুকরণে বলা যায়, আহমদ ছফার গাভী বিত্তান্তে যতটা উত্তেজনা, উপভোগ্যতা আছে ততটা চারিত্রিক দৃঢ়তার আচ্ছন্নতা নেই।


SIMILAR BOOKS

PAYMENT OPTIONS

Copyrights © 2018-2022 BoiBazar.com